যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় অনুষ্ঠিত ফিফা বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল মিসর ও আর্জেন্টিনা। কাগজে-কলমে এটি ছিল একটি নকআউট ম্যাচ, কিন্তু বাস্তবে এটি পরিণত হয় টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বিতর্কিত এবং রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে আলোচিত লড়াইয়ে।
ম্যাচে ১-০ গোলে এগিয়ে থাকার পর মিসরের দ্বিতীয় গোলটি বিতর্কিত সিদ্ধান্তে বাতিল করা হয়। পরে আর্জেন্টিনার একটি গোলের আগে সম্ভাব্য ফাউলের অভিযোগে মিসর ভিএআর পর্যালোচনার আবেদন জানালেও তা নাকচ করে দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত ৩-২ ব্যবধানে হেরে বিদায় নেয় মিসর।
ম্যাচ শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে ফুটবল বিশ্লেষকদের আলোচনায় উঠে আসে একটাই প্রশ্ন—ভিএআর কি সত্যিই নিরপেক্ষ ছিল?
মিসরের কোচ হোসাম হাসান সরাসরি ম্যাচটিকে ‘অন্যায্য’ বলে মন্তব্য করেন। তাঁর অভিযোগ, ফিফা চেয়েছিল লিওনেল মেসিকে নিয়ে আর্জেন্টিনা যেন পরবর্তী পর্বে উঠে যায়। এ ঘটনায় মিসরীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেছে।
তবে এই বিতর্কের আড়ালে আরও বড় একটি বাস্তবতা রয়েছে। অনেকের কাছে ম্যাচটি শুধু ফুটবল ছিল না; এটি হয়ে উঠেছিল ফিলিস্তিন প্রশ্নে বৈশ্বিক অবস্থানের প্রতীক।
বর্তমান বিশ্বে ইসরায়েল–ফিলিস্তিন ইস্যু কেবল কূটনৈতিক নয়, নৈতিক অবস্থানেরও সূচক হয়ে উঠেছে। সেই বিভাজনরেখা এখন ক্রীড়াঙ্গনেও স্পষ্ট।
ম্যাচের আগেই কোচ হোসাম হাসান ফিলিস্তিনিদের দুর্দশা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেন। নকআউট পর্বে মিসরের ঐতিহাসিক জয়ের পর মাঠে ফিলিস্তিনের পতাকা ওড়ান তিনি। পরে সংবাদ সম্মেলনে সেই জয় ফিলিস্তিনের জনগণকে উৎসর্গ করেন।
ম্যাচের আগের দিন তিনি বলেন, ‘ফিলিস্তিনিদের প্রতি যার সহানুভূতি নেই, সে প্রকৃত অর্থে মানুষই নয়।’
এই অবস্থান মাঠের গ্যালারিতেও প্রতিফলিত হয়। গাজার ফিলিস্তিনিরা মিসরের পতাকা হাতে দলটিকে সমর্থন জানান। অন্যদিকে স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনার কিছু সমর্থক ইসরায়েলের পতাকা প্রদর্শন করলে মিসরীয় সমর্থকেরা পাল্টা ফিলিস্তিনের পতাকা উড়িয়ে প্রতিক্রিয়া জানান।
এই প্রতীকী লড়াইকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে আর্জেন্টিনার বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। দেশটির জনমতের একটি বড় অংশ ইসরায়েলের নীতির সমালোচক হলেও প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই প্রকাশ্যে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও বহুবার আলোচনায় এসেছে। দুই নেতাই নিজেদের ইসরায়েলের দৃঢ় সমর্থক হিসেবে তুলে ধরেছেন।
এদিকে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক নিয়েও দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থাটির সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাজনৈতিক প্রভাবের আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
যদিও মিসর–আর্জেন্টিনা ম্যাচে সরাসরি কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের প্রমাণ সামনে আসেনি, তবু এই বিতর্ক এমন এক সময়ে তৈরি হয়েছে, যখন আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগের বিচার চলছে এবং গাজা যুদ্ধ নিয়ে বিশ্বব্যাপী তীব্র বিতর্ক বিরাজ করছে।
এই প্রেক্ষাপটে মিসরের বাতিল হওয়া গোল, আর্জেন্টিনার কয়েকটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত এবং ভিএআর ব্যবহারে অসঙ্গতির অভিযোগ অনেকের কাছে শুধু একটি ম্যাচের ভুল সিদ্ধান্ত নয়; বরং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতার প্রতিফলন হিসেবেই ধরা দিয়েছে।
এর অর্থ এই নয় যে ফিফা পরিকল্পিতভাবে আর্জেন্টিনাকে জিতিয়েছে। তবে বড় প্রশ্নটি অন্য জায়গায়—যখন কোনো প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে প্রশ্ন ওঠে, তখন প্রতিটি বিতর্কিত সিদ্ধান্তই সেই আস্থাহীনতাকে আরও গভীর করে।
ফুটবলের ইতিহাসে এই ম্যাচ হয়তো ভিএআর বিতর্কের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে। কিন্তু ফিলিস্তিনপন্থী লাখো সমর্থকের কাছে এটি আরও বেশি মনে থাকবে কোচ হোসাম হাসানের হাতে উড়তে থাকা ফিলিস্তিনের পতাকা এবং বিশ্বমঞ্চে নিপীড়িত মানুষের পক্ষে উচ্চারিত তাঁর স্পষ্ট অবস্থানের জন্য।
— মোহামাদ এলমাসরি
দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক
আল-জাজিরা থেকে অনূদিত



