ভালোবাসার সম্পর্কে মান-অভিমান, ভুল বোঝাবুঝি কিংবা সঙ্গীর অনুভূতি নিয়ে মাঝেমধ্যে দ্বিধা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সেই দ্বিধা যখন বারবার ফিরে আসে, মনের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি করে এবং সম্পর্ক নিয়ে স্বাভাবিক চিন্তাভাবনাকে ব্যাহত করতে শুরু করে, তখন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অনেকেই সম্পর্কে থাকার পরও নিজেকে প্রশ্ন করেন—‘আমি কি সত্যিই তাকে ভালোবাসি?’, ‘সেও কি আমাকে আগের মতো ভালোবাসে?’, ‘আমি কি ভুল সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছি?’ এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার পরও যদি একই সংশয় বারবার ফিরে আসে, তাহলে তা সাধারণ দুশ্চিন্তার বাইরে গিয়ে নেতিবাচক চিন্তার চক্র তৈরি করতে পারে।
বারবার নিজের অনুভূতি যাচাই
এ ধরনের সংশয়ে ভুগলে অনেকে নিজের অনুভূতিকে বারবার পরীক্ষা করতে থাকেন। সঙ্গীর সঙ্গে দেখা হলে আগের মতো ভালো লাগছে কি না, তার প্রতি আকর্ষণ রয়েছে কি না কিংবা সম্পর্কটি আগের মতো আনন্দ দিচ্ছে কি না—এসব বিষয় নিয়ে নিজের মনকে বারবার যাচাই করেন।
কেউ কেউ পুরোনো ছবি বা স্মৃতি মনে করে সম্পর্কের গভীরতা পরিমাপ করার চেষ্টা করেন। আবার অন্য দম্পতিদের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের তুলনা করেও বোঝার চেষ্টা করেন, তাদের ভালোবাসা ‘যথেষ্ট’ কি না। কিন্তু এভাবে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা যত বাড়ে, সংশয়ও তত গভীর হতে পারে।
ছোট বিষয়েও সন্দেহ
সঙ্গীর সামান্য পরিবর্তনও তখন বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মেসেজের উত্তর দিতে কিছুটা দেরি করা, স্বাভাবিকের চেয়ে কম কথা বলা কিংবা প্রশংসা না করাকেও কেউ কেউ ভালোবাসা কমে যাওয়ার লক্ষণ হিসেবে ধরে নিতে পারেন।
অস্বস্তি কমাতে তখন সঙ্গীর কাছ থেকে বারবার নিশ্চয়তা চাওয়া শুরু হয়। একই বিষয় নিয়ে বন্ধু বা কাছের মানুষের মতামতও নেওয়া হয়। এতে সাময়িক স্বস্তি মিললেও দীর্ঘমেয়াদে একই প্রশ্ন আবার ফিরে আসতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও সম্পর্ক নিয়ে অযথা সন্দেহ বাড়িয়ে দিতে পারে। অন্য দম্পতিদের হাসিখুশি ছবি, ঘোরাঘুরি কিংবা রোমান্টিক মুহূর্ত দেখে নিজের সম্পর্কের সঙ্গে তুলনা করার প্রবণতা তৈরি হয়।
কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণত সম্পর্কের ইতিবাচক মুহূর্তগুলোই বেশি দেখা যায়। ফলে অন্যদের সাজানো সুখের সঙ্গে নিজের বাস্তব জীবনের সম্পর্কের তুলনা করলে অযথা হতাশা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
সব সন্দেহ অবশ্য অমূলক নয়
তবে সম্পর্ক নিয়ে সব ধরনের সন্দেহকে মানসিক সমস্যা হিসেবে দেখা ঠিক নয়। যদি সঙ্গীর প্রতারণা, নিয়মিত মিথ্যাচার, অসম্মান, দায়িত্বহীনতা বা অন্য কোনো স্পষ্ট আচরণের কারণে সন্দেহ তৈরি হয়, তাহলে সেটির বাস্তব ভিত্তি থাকতে পারে।
সমস্যা তখনই বেশি হয়, যখন কোনো দৃশ্যমান কারণ ছাড়াই একই ধরনের আশঙ্কা বারবার মাথায় আসে এবং ব্যক্তি ক্রমাগত সম্পর্কের নিশ্চয়তা খুঁজতে থাকেন।
কী করবেন?
প্রথমেই মনে রাখতে হবে, মনের মধ্যে কোনো চিন্তা আসা মানেই সেটি সত্যি—এমন নয়। তাই প্রতিটি সন্দেহের সঙ্গে সঙ্গে তার উত্তর খোঁজা কিংবা সঙ্গীর কাছ থেকে নিশ্চয়তা নেওয়ার অভ্যাস কমাতে হবে।
নিজের অনুভূতি বারবার পরীক্ষা করা, অন্যের সম্পর্কের সঙ্গে তুলনা করা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় কাটানোর প্রবণতা থেকেও ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসতে হবে।
সঙ্গীর সঙ্গে খোলামেলা ও শান্তভাবে নিজের অনুভূতি নিয়ে কথা বলা যেতে পারে। তবে একই বিষয় নিয়ে বারবার প্রশ্ন করে সম্পর্কের ওপর চাপ তৈরি না করাই ভালো।
আর যদি এই সন্দেহ ও দুশ্চিন্তা এতটাই বেড়ে যায় যে দৈনন্দিন জীবন, কাজ বা সম্পর্কের স্বাভাবিকতা ব্যাহত হচ্ছে, তাহলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বা সাইকোথেরাপিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
একটি সুস্থ সম্পর্কের জন্য সবকিছুর শতভাগ নিশ্চয়তা পাওয়া জরুরি নয়। বরং কিছুটা অনিশ্চয়তা মেনে নিয়ে পারস্পরিক আস্থা, যোগাযোগ ও বোঝাপড়ার মাধ্যমে সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
