কের বিশ্বকে বোঝার সূচনা ১৭৭৬ সাল থেকে নয়, বরং ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর অবসানকে যুক্তরাষ্ট্র এমনভাবে ব্যাখ্যা করেছিল যেন বিশ্বব্যবস্থাকে নিজের ইচ্ছামতো গড়ে তোলার একচ্ছত্র অধিকার তারা অর্জন করেছে।
সেই ভুল ধারণা থেকেই জন্ম নেয় ‘একক বিশ্বনেতৃত্বের’ নীতি। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব ও আধিপত্য স্থায়ী করার প্রতিযোগিতায় নামে ওয়াশিংটন।
এই মনোভাবের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিফলন পাওয়া যায় সাবেক মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জিবিগনিউ ব্রজেজিনস্কির ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত দ্য গ্র্যান্ড চেসবোর্ড গ্রন্থে। সেখানে ইউরেশিয়ায় মার্কিন আধিপত্য বজায় রাখা এবং সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির উত্থান প্রতিহত করার কৌশল তুলে ধরা হয়েছিল। ধীরে ধীরে এই চিন্তাধারাই মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম ভিত্তিতে পরিণত হয়।
একই সময়ে আরব বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ধারণা ছিল, ওয়াশিংটনের নেতৃত্ব মেনে নিলে বিনিময়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। উপসাগরীয় অঞ্চলে একের পর এক মার্কিন সামরিক ঘাঁটি সেই কৌশলেরই প্রতিফলন।
তবে প্রশ্নটি কখনোই হারিয়ে যায়নি—এই ঘাঁটিগুলো আসলে কার নিরাপত্তা নিশ্চিত করছিল?
ইরান যুদ্ধ এবং মোহভঙ্গ
কিছু আরব রাষ্ট্র আরও এক ধাপ এগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ককে নিজেদের নিরাপত্তার মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে। তাদের বিশ্বাস ছিল, সবচেয়ে শক্তিশালী পক্ষের সঙ্গে থাকাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
কিন্তু ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সংঘাত সেই ধারণাকে কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার লক্ষ্য ছিল শুধু সামরিক চাপ সৃষ্টি নয়; প্রকাশ্যে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের কথাও বলা হয়েছিল। ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের কয়েকজন সদস্য নিহত হন।
তবে প্রত্যাশিত ফল আসেনি। ইরান রাষ্ট্র হিসেবে ভেঙে পড়েনি। বরং দ্রুত নতুন নেতৃত্ব ঘোষণা করে পাল্টা হামলা চালায় এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করে। এর প্রভাব পড়ে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতেও।
দীর্ঘ সামরিক অভিযান, বিপুল অর্থ ব্যয় এবং ব্যাপক প্রাণহানির পরও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির পথেই ফিরতে হয়েছে।
এই অভিজ্ঞতা দুটি বিষয় স্পষ্ট করেছে। প্রথমত, মার্কিন সামরিক শক্তিরও বাস্তব সীমাবদ্ধতা রয়েছে। দ্বিতীয়ত, নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা পুরোপুরি একটি বহিরাগত শক্তির ওপর নির্ভরশীল করে তোলার কৌশল দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।
ওয়াশিংটনের সামনে নতুন বাস্তবতা
২৫০ বছরে দাঁড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হতে পারে—মধ্যপ্রাচ্যে একতরফাভাবে রাজনৈতিক সমাধান চাপিয়ে দেওয়ার যুগ শেষ হয়ে এসেছে।
অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘ সনদ এবং ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে ফিলিস্তিন প্রশ্নের বাস্তবসম্মত সমাধানের পথে এগোতে হবে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতকে উসকে দেয়—এমন যেকোনো সম্প্রসারণবাদী ধারণা থেকে সরে আসাও প্রয়োজন।
আরব বিশ্বের জন্য কী শিক্ষা
এই সংকট আরব দেশগুলোর জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।
তাদের নিরাপত্তা কৌশল আর কেবল বাইরের শক্তির ওপর নির্ভরশীল থাকতে পারে না। বরং আঞ্চলিক সহযোগিতা, পারস্পরিক আস্থা এবং যৌথ নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
ইরানের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখা, পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে আঞ্চলিক সংলাপ বাড়ানো এবং নিজেদের ভূরাজনীতিকে পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার হাতিয়ার হতে না দেওয়াই হতে পারে ভবিষ্যতের পথ।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়াসহ সব বড় শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি।
বহুমুখী বিশ্বের দিকে
ইরানকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সংঘাত আরেকটি বাস্তবতাও সামনে এনেছে—বিশ্ব ধীরে ধীরে একক শক্তিনির্ভর ব্যবস্থা থেকে বহুমুখী ক্ষমতার ভারসাম্যের দিকে এগোচ্ছে।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে নিজেকে খাপ খাওয়াবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। তারা কি নতুন বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে নেতৃত্ব দেবে, নাকি একক আধিপত্য ধরে রাখার ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে?
২৫০ বছরে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে দূরদর্শী সিদ্ধান্ত হতে পারে বহুমুখী বিশ্বের বাস্তবতাকে স্বীকার করে সমতা, সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে বৈশ্বিক সম্পর্ক পুনর্গঠন করা।
অন্যদিকে আরব বিশ্বের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা—কোনো বিদেশি রক্ষাকর্তার অপেক্ষায় না থেকে নিজেদের ঐক্য, সক্ষমতা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা গড়ে তোলা।



