ম্যাচ যত শেষের দিকে গড়ায়, শরীর তত নিজের সীমার কথা মনে করিয়ে দেয়। পেশিতে টান ধরে, শ্বাস হয়ে ওঠে ভারী, পা যেন আর আগের মতো সাড়া দিতে চায় না। কিন্তু ফুটবল কোনো অজুহাত মানে না। এই খেলার একটাই দাবি—দৌড়াতে হবে, লড়তে হবে, শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত হাল ছাড়া যাবে না।
সেই নির্মম বাস্তবতার মধ্যেই বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে আগামীকাল মুখোমুখি হচ্ছে আর্জেন্টিনা ও মিসর।
দুই দলের নকআউট যাত্রাই শুরু হয়েছে কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে। জয়ের জন্য নব্বই মিনিট যথেষ্ট হয়নি কারও। আর্জেন্টিনাকে লড়তে হয়েছে অতিরিক্ত সময়ের ১২০ মিনিট পর্যন্ত, আর মিসরকে যেতে হয়েছে আরও এক ধাপ দূরে—টাইব্রেকারের স্নায়ুচাপের লড়াইয়ে। ফলে বিশ্রামের সুযোগ বলতে যা বোঝায়, তা এখন দুই দলের কাছেই প্রায় বিলাসিতা।
গত শুক্রবার কেপ ভার্দের বিপক্ষে ৩-২ গোলের জয় পেয়েছে আর্জেন্টিনা। স্কোরলাইন হয়তো স্বস্তির গল্প বলে, কিন্তু মাঠের বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। লিওনেল স্কালোনির দলকে শেষ পর্যন্ত লড়তে হয়েছে শুধু প্রতিপক্ষের বিপক্ষে নয়, সময়, ক্লান্তি এবং নিজেদের সীমাবদ্ধতার সঙ্গেও।
মিসরের গল্প আরও নাটকীয়। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে নির্ধারিত সময় ও অতিরিক্ত সময় পেরিয়েও নিষ্পত্তি হয়নি ম্যাচের। শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে ৪-২ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে তারা। দীর্ঘ এক যুদ্ধ শেষে বেঁচে থাকার গল্প যেন।
এবার সেই দুই ক্লান্ত যোদ্ধাই নামবে একই মঞ্চে। আগামীকাল আটলান্টায়, বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায়।
কাগজে-কলমে এগিয়ে আর্জেন্টিনা। বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন, অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার, তারকাখচিত স্কোয়াড—সব হিসাবই তাদের পক্ষে। কিন্তু ফুটবল কখনো কেবল কাগজের অঙ্কে চলে না। কেপ ভার্দের বিপক্ষে ম্যাচটি বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের ঘিরে কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। গ্রুপ পর্বে অনায়াসে এগিয়ে যাওয়া দলটি হঠাৎই যেন নিজের দুর্বলতার মুখোমুখি হয়েছে। প্রতিপক্ষের চাপে একাধিকবার নড়বড়ে হয়ে উঠেছে তাদের রক্ষণ ও সংগঠন।
প্রশ্ন তাই একটাই—ওটা কি ছিল স্রেফ একটি খারাপ দিন, নাকি বড় কোনো দুর্বলতার ইঙ্গিত?
যদি সেই ফাটল সত্যিই থেকে থাকে, তবে মিসর নিশ্চয়ই সেখানে আঘাত হানতে চাইবে।
ইএসপিএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আর্জেন্টিনার সাবেক স্ট্রাইকার সের্হিও আগুয়েরোও তুলে ধরেছেন সেই শঙ্কার কথা।
“আমার সবচেয়ে বড় উদ্বেগ বিশ্রামের সময় নিয়ে। হাতে মাত্র চার দিন। অনেক খেলোয়াড়ই ক্র্যাম্পে ভুগছে। আর সামনে এমন একটি দল, যারা শারীরিকভাবে অসাধারণ শক্তিশালী। আক্রমণেও তারা কেপ ভার্দের চেয়ে বেশি বিপজ্জনক।”
লিওনেল মেসিও ক্লান্তির বিষয়টি আড়াল করেননি। কেপ ভার্দের বিপক্ষে আক্রমণে ধার না থাকার হতাশাও ছিল তাঁর কণ্ঠে। সেই ম্যাচ এখন মিসরের জন্য যেন একটি প্রস্তুতির নকশা—বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের কোথায় অস্বস্তিতে ফেলা যায়, তার বাস্তব উদাহরণ।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মিসরের পারফরম্যান্সেও মিলেছে সেই ইঙ্গিত। রক্ষণে শৃঙ্খলা, সুযোগ পেলেই দ্রুত পাল্টা আক্রমণ—মোহাম্মদ সালাহ ও ওমার মারমুশের গতিকে কাজে লাগিয়ে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলার কৌশল। আর্জেন্টিনার বিপক্ষেও সম্ভবত একই পরিকল্পনাই দেখা যাবে।
এই ম্যাচে আলো থাকবে দুই তারকা ফরোয়ার্ডের ওপর। একদিকে টুর্নামেন্টে ৭ গোল করা মেসি, অন্যদিকে ফিট থাকলে মিসরের সবচেয়ে বড় ভরসা সালাহ। যদিও হ্যামস্ট্রিংয়ের শঙ্কা নিয়েই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পুরো ১২০ মিনিট খেলেছেন তিনি। অনেক সময় পুরো গতিতে দৌড়াতে পারেননি। তবু বড় ম্যাচের মঞ্চে বড় খেলোয়াড়রা প্রায়ই নিজেদের নতুন করে প্রমাণ করেন।
আর্জেন্টিনাও সেটি জানে। তাই সতর্কতার সুর শোনা গেছে মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রো পারেদেসের কণ্ঠেও।
“এটা খুব কঠিন ম্যাচ হবে। আমরা ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলছি। এখানে প্রতিটি দলই মানসম্পন্ন এবং শারীরিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী।”
কথাগুলো হয়তো সাধারণ শোনায়, কিন্তু এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে ম্যাচের প্রকৃত চিত্র। একদিকে ক্লান্ত শরীর, অন্যদিকে অদম্য লড়াইয়ের মানসিকতা। একদিকে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে নিজেদের প্রমাণ করার অদম্য ক্ষুধা।
তাই এই ম্যাচ শুধু কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিটের লড়াই নয়। এটি সহনশীলতার পরীক্ষা, মানসিক দৃঢ়তার পরীক্ষা, কৌশল ও সাহসের পরীক্ষা।
শেষ পর্যন্ত হয়তো জিতবে সেই দলই, যার শরীর নয়—হৃদয় সবচেয়ে বেশি শক্ত।



