টানা ভারী বৃষ্টিতে খাগড়াছড়ির পাহাড়ি জনপদ যেন ধীরে ধীরে পানির নিচে হারিয়ে যাচ্ছে। একের পর এক সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় থমকে গেছে স্বাভাবিক জীবন। আজ মঙ্গলবার সকাল থেকে খাগড়াছড়ি–রাঙামাটি সড়কের একাধিক স্থানে পানি ওঠায় সরাসরি সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফলে খাগড়াছড়ির সঙ্গে রাঙামাটির গুরুত্বপূর্ণ সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
সোমবার থেকে শুরু হওয়া টানা বর্ষণে মহালছড়ি উপজেলার চব্বিশ মাইল, মাইসছড়ি ও কেরেঙ্গেনালা এলাকার সড়ক হাঁটুপানি থেকে কোথাও কোথাও কোমরপানিতে তলিয়ে গেছে। জরুরি প্রয়োজনেও যানবাহনের বিকল্প না থাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের পানি ডিঙিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে। দুর্ভোগে পড়েছেন শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও সাধারণ মানুষ।
আজ সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মহালছড়ির মাইসছড়ি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সড়কের ওপর হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি। স্থানীয়দের অভিযোগ, সেচ নালার স্লুইসগেট বন্ধ থাকায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে পারেনি। ফলে পুরো সড়কই ডুবে গেছে। স্কুল ছুটির পর ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের বই-খাতা হাতে বন্যার পানি পেরিয়ে বাড়ি ফিরতে দেখা যায়—যা এ অঞ্চলের দুর্ভোগের বাস্তব চিত্রই তুলে ধরে।
এই সড়কেই আটকা পড়েন ব্যাংক কর্মকর্তা অশোক চাকমা। জরুরি কাজে খাগড়াছড়ি থেকে রাঙামাটির উদ্দেশে রওনা হলেও যান চলাচল বন্ধ থাকায় মাইসছড়িতে এসে থেমে যেতে হয় তাঁকে। কোনোভাবে বিকল্প যানবাহনের ব্যবস্থা হলে তবেই গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন বলে জানান তিনি।
অবিরাম বৃষ্টিতে জেলার চেঙ্গী ও মাইনী নদীসহ বিভিন্ন খাল-ছড়ার পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। আজ দুপুর থেকে জেলা সদর, মহালছড়ি ও দীঘিনালার বিভিন্ন নিচু এলাকায় পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় বন্যার আশঙ্কাও ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।
দীঘিনালা আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের বেলুন মেকার সুভূতি চাকমা জানান, আজ বেলা ১টা পর্যন্ত গত ১৮ ঘণ্টায় ৯০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়ার বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, বৃষ্টি আরও কিছু সময় অব্যাহত থাকতে পারে।
অন্যদিকে ভারী বর্ষণের সঙ্গে বেড়েছে পাহাড়ধসের ঝুঁকিও। যদিও আজ দুপুর পর্যন্ত জেলার কোথাও পাহাড়ধসের খবর পাওয়া যায়নি, তবু সম্ভাব্য বিপর্যয় এড়াতে আগাম প্রস্তুতি শুরু করেছে প্রশাসন। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে।
জেলা সদরের শালবন, মোহাম্মদপুর, সবুজবাগ ও কুমিল্লা টিলা এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে কলাবাগান, নান্সীবাজার, মোল্লাপাড়া, কৈবল্যপিঠ, আঠারো পরিবার, শালবন ও মোহাম্মদপুরসহ পাহাড়ের ঢালে বসবাসকারী শত শত পরিবারকে সতর্ক অবস্থায় থাকতে এবং প্রয়োজনে দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত জানিয়েছেন, সম্ভাব্য যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশাসনের পূর্ণ প্রস্তুতি রয়েছে। ইতোমধ্যে পর্যাপ্ত শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। সম্ভাব্য বন্যাপ্রবণ এলাকার আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
পাহাড়ি জনপদে বৃষ্টি এখন শুধু স্বস্তির নয়, উদ্বেগেরও নাম। পানি যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে মানুষের অনিশ্চয়তা। এখন সবার নজর আকাশের দিকে—বৃষ্টি থামবে, নাকি সামনে অপেক্ষা করছে আরও বড় দুর্যোগ।



