মানুষ বাড়ছে, কিন্তু জমি বাড়ছে না। শহর বড় হচ্ছে, কিন্তু বাসস্থান নয়। শিক্ষিত তরুণ বাড়ছে, কিন্তু চাকরি নয়। হাসপাতাল বাড়ছে, কিন্তু রোগীর চাপ তার চেয়েও দ্রুত। বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় নীরব সংকটের নাম—জনসংখ্যা।
মাত্র ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গকিলোমিটারের এই ছোট্ট দেশে এখন বাস করছেন প্রায় ১৭ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর জনসংখ্যা বাড়ছে ১ দশমিক ২২ শতাংশ হারে। অর্থাৎ প্রতি বছর দেশের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে প্রায় ২০ লাখ নতুন মানুষ।
জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড পপুলেশন প্রসপেক্টস বলছে, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ২০ কোটির কাছাকাছি পৌঁছে যাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই জনসংখ্যা দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ নয়, বরং সবচেয়ে বড় বোঝায় পরিণত হতে পারে।
জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাঁচ বড় ঝুঁকি
অর্থনীতিবিদ ও জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন সূচক বিশেষজ্ঞ সেলিম জাহান সতর্ক করে বলেছেন, বাংলাদেশের মতো সীমিত আয়তনের দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ঊর্ধ্বগতি একটি অশনিসংকেত। তাঁর মতে, এর সরাসরি প্রভাব পড়বে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে—
- খাদ্য উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা
- আবাসন সংকট ও বস্তির বিস্তার
- শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মানের অবনতি
- কর্মসংস্থানের সংকট ও বেকারত্ব বৃদ্ধি
- আমদানিনির্ভরতা ও অর্থনৈতিক চাপ
মানুষ বাড়ছে, জমি কমছে
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা তার ভূখণ্ড। মাথাপিছু জমির পরিমাণ এখন মাত্র ০.২১ একর। প্রতি বছর প্রায় ১ শতাংশ কৃষিজমি চলে যাচ্ছে আবাসন ও অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পে। অন্যদিকে নদীভাঙনে হারিয়ে যাচ্ছে প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমি।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ২০৫০ সালে মাথাপিছু জমি নেমে আসবে ০.১৫ একরেরও নিচে, যা খাদ্য নিরাপত্তাকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
খাদ্য উৎপাদন বাড়লেও কেন উদ্বেগ?
স্বাধীনতার পর চাল উৎপাদন চার গুণেরও বেশি বেড়েছে। তবু বাংলাদেশকে নিয়মিত চাল, গম, ভোজ্যতেল, ডাল, চিনি, দুধসহ নানা খাদ্যপণ্য আমদানি করতে হচ্ছে।
শুধু ২০২৪-২৫ অর্থবছরেই খাদ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৯০৭ কোটি মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা।
বিশ্ববাজারে যুদ্ধ বা সংকট তৈরি হলেই তার প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তায়।
পরিবারেও বাড়ছে চাপ
রাজধানীর বাসিন্দা ইমরান হোসেন দ্বিতীয় সন্তানের কথা ভাবছেন। কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না।
হাসপাতালের খরচ, শিশুখাদ্য, ডায়াপার, স্কুল, চিকিৎসা—সব মিলিয়ে পরিবারের ব্যয় এমনিতেই অনেক। তিনি বলছেন, “আরেকটি সন্তান নিলে খরচ অনেক বেড়ে যাবে। কিন্তু আয় তো সেই হারে বাড়বে না।”
এই দুশ্চিন্তা শুধু একটি পরিবারের নয়; দেশের লাখো মধ্যবিত্ত পরিবারের বাস্তবতা।
শহর বাড়ছে, বাসস্থান নয়
গ্রাম থেকে শহরে মানুষের ঢল অব্যাহত। কিন্তু সেই তুলনায় বাড়ছে না পরিকল্পিত আবাসন।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশের শহরাঞ্চলের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ মানুষ বস্তি কিংবা নিম্নমানের আবাসনে বসবাস করেন।
প্রাক্কলন বলছে, ২০৫০ সালে শহরে বাস করবে প্রায় ১২ কোটি মানুষ, যার মধ্যে ৪ থেকে ৫ কোটি মানুষ বাস করতে পারেন অস্বাস্থ্যকর ও অনিরাপদ পরিবেশে।
হাসপাতালগুলোতে রোগীর ঢল
দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর চিত্র এখন প্রায় একই—বেড নেই, বারান্দা ও মেঝেতে চলছে চিকিৎসা।
২০২৪ সালের স্বাস্থ্য বুলেটিন অনুযায়ী, সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন ১ লাখ ৮৪ হাজারের বেশি মানুষ চিকিৎসাসেবা নেন। বেসরকারি খাত মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৪ লাখ ৬৫ হাজার মানুষ হাসপাতালে বা ক্লিনিকে যাচ্ছেন।
কিন্তু এই বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী এখনো পর্যাপ্ত নয়।
শিক্ষা: সংখ্যার চেয়ে বড় সংকট মানের
জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও। কিন্তু একই হারে বাড়ছে না শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষ কিংবা শিক্ষা অবকাঠামো।
অনেক স্কুলে এখন একটি শ্রেণিকক্ষে ৫০ থেকে ৭০ জন শিক্ষার্থী একসঙ্গে ক্লাস করে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ২০৫০ সালে শহরাঞ্চলে এই সংখ্যা ৮০ থেকে ১০০ জনে পৌঁছাতে পারে।
ফলে শিক্ষার মান আরও নেমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
শিক্ষিত তরুণ, কিন্তু চাকরি নেই
বাংলাদেশে এখন বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ২৪ হাজার। এর মধ্যে ৮ লাখ ৮৫ হাজারই স্নাতক ডিগ্রিধারী।
অর্থাৎ প্রতি তিনজন বেকারের একজন উচ্চশিক্ষিত।
আইএমএফ বলছে, শিক্ষায় অগ্রগতি হলেও কর্মসংস্থান সেই হারে বাড়েনি। ফলে শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে বেকারত্ব উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
সম্পদ নাকি দায়?
বিশ্বের বহু দেশ বিপুল জনসংখ্যাকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করে অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত করেছে। কিন্তু সেই জন্য প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষা, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান।
বাংলাদেশে যদি এই খাতগুলোতে দ্রুত বিনিয়োগ ও কার্যকর পরিকল্পনা না হয়, তাহলে বাড়তে থাকা জনসংখ্যা দেশের উন্নয়নের চালিকাশক্তি নয়, বরং সবচেয়ে বড় বাধায় পরিণত হবে।
অর্থনীতিবিদ সেলিম জাহানের ভাষায়, “জনসংখ্যা বৃদ্ধিজনিত সংকট দেশের অর্জিত উন্নয়নকে ভঙ্গুর করে তুলবে। তখন জনসংখ্যা বাংলাদেশের সম্পদ নয়, দায় হয়ে উঠবে।”



