রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওয়াশিংটন ও কিয়েভ। যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্র ইউক্রেনের মাটিতেই তৈরির লাইসেন্স নিয়ে দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি।
গত বৃহস্পতিবার এ ঘোষণা দিয়ে তিনি জানান, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের একটি বড় চালান ইউক্রেনে পৌঁছাবে।
প্যাট্রিয়ট বিশ্বের অন্যতম কার্যকর আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। বিশেষ করে রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে সক্ষম পশ্চিমা প্রযুক্তির অল্প কয়েকটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে এটি অন্যতম। সাম্প্রতিক সময়ে কিয়েভসহ ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বেড়ে যাওয়ায় এই ব্যবস্থার গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
তুরস্কে অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলন এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক শেষে দেশে ফিরে সাংবাদিকদের জেলেনস্কি বলেন, শুধু প্যাট্রিয়ট নয়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ড্রোন কেনা এবং যৌথভাবে ড্রোন উৎপাদনের বিষয়েও আলোচনা চলছে।
ন্যাটো সম্মেলনকে ইউক্রেনের জন্য ‘সফল’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা নতুন সামরিক সহায়তা প্যাকেজ পাব। পাশাপাশি এমন কিছু চুক্তি হয়েছে, যা ভবিষ্যতে আমাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করবে।’
জেলেনস্কি জানান, এখন লক্ষ্য হলো যত দ্রুত সম্ভব প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে ইউক্রেনেই প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন শুরু করা। এ জন্য সংশ্লিষ্ট কারিগরি দল, মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থাগুলোকে দ্রুত কাজ শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিমা মিত্রদের কাছে আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চেয়ে আসছে কিয়েভ। বিশেষ করে রাজধানী কিয়েভসহ বিভিন্ন শহরে রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বাড়ার পর প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা আরও জরুরি হয়ে উঠেছে।
ন্যাটো সম্মেলনে জেলেনস্কিকে উদ্দেশ করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা আপনাদের প্যাট্রিয়ট তৈরির অধিকার দেব। এটি কীভাবে তৈরি করতে হয়, সেটিও দেখিয়ে দেব। প্রযুক্তিটি জটিল, তবে আপনারা দ্রুতই তা আয়ত্ত করতে পারবেন। এরপর আর বলতে পারবেন না যে আমরা যথেষ্ট অস্ত্র দিচ্ছি না।’
তবে ইউক্রেনে এই প্রযুক্তির উৎপাদন কবে শুরু হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাননি ট্রাম্প। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন, যুক্তরাষ্ট্র তার নিজস্ব মজুত অস্ত্র নিজেদের কাছেই রাখবে।
ইউক্রেনও জানিয়েছে, যত দ্রুত সম্ভব এই প্রযুক্তি আয়ত্ত করে নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলার চেষ্টা করবে।
জার্মানির ব্রেমেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক নিকোলে মিত্রোখিন মনে করেন, স্বল্পমেয়াদে ইউক্রেনের তাৎক্ষণিক লাভ সীমিত হলেও এই প্রযুক্তির লাইসেন্স দেশটির জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, এটি ইউক্রেনের নিজস্ব ব্যালিস্টিক ও কাউন্টার-ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে নতুন গতি দেবে।
তবে ইউক্রেন পুরো প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নয়, মূলত এর ক্ষেপণাস্ত্র অংশ উৎপাদনে আগ্রহী। কারণ, এই ব্যবস্থার রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ প্ল্যাটফর্ম এবং বিশেষায়িত মোবাইল লঞ্চার তৈরির প্রযুক্তি অনেক বেশি জটিল। এসব উপাদান দ্রুত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরিয়ে নেওয়া যায়, ফলে শত্রুপক্ষের পক্ষে সেগুলো শনাক্ত ও ধ্বংস করা কঠিন হয়ে পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তকে বিশ্লেষকেরা ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা শিল্পে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখছেন।



